ব্যুরো নিউজ, ১৯শে নভেম্বর ২০২৫ : আন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরী এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সহিত এক সংঘর্ষে কুখ্যাত নকশাল নেতা মাদভি হিড়মা (Madavi Hidma) নিহত হইয়াছেন। এক কোটি টাকারও অধিক পুরস্কার ঘোষিত এই কমান্ডার তাহার দ্বিতীয় পত্নী রাজে ওরফে রাজাক্কা এবং আরও চারজন ক্যাডারের সহিত প্রাণ হারাইয়াছেন। গ্রেইহাউন্ড বাহিনীর দ্বারা চালিত এই অভিযানে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর পিএলজিএ ব্যাটালিয়ন-১ ইউনিটটি লক্ষ্য করা হইয়াছিল, যাহার নেতৃত্ব দিত হিড়মা।
এনকাউন্টারের বিস্তারিত বিবরণ
আন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানা সীমান্তের অরণ্যে গত মঙ্গলবার (নভেম্বর মাসের ১৮ তারিখ) ভোর ৬টা হইতে ৭টার মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মাওবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধির গোয়েন্দা রিপোর্ট পাইয়া নিরাপত্তা বাহিনী একটি নিখুঁত তল্লাশি অভিযান শুরু করে, যা পরে বন্দুকযুদ্ধে পরিণত হয়।
এই অভিযানে নিহত ছয়জন মাওবাদীর মধ্যে রহিয়াছেন:
মাদভি হিড়মা: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (Central Committee Member – CCM)।
রাজে ওরফে রাজাক্কা: ডেপুটি কমিটি সদস্য (Deputy Committee Member – DVCM) এবং হিড়মার স্ত্রী।
চেল্লুরি নারায়ণ (@সুরেশ): স্পেশাল জোনাল কমিটি সদস্য (Special Zonal Committee Member – SZCM)।
টেক শঙ্কর (অন্যান্য রিপোর্টে এই নামধারী একজনকে মেটুরি জোখা রাও ওরফে শঙ্কর বলিয়া শনাক্ত করা হইয়াছে)।
আন্ধ্রপ্রদেশের ডিজিপি হরিশ কুমার গুপ্ত এই অভিযানটি নিশ্চিত করিয়াছেন এবং জানাইয়াছেন যে, অবশিষ্ট হুমকি নস্যাৎ করিবার জন্য এলাকায় বৃহৎ আকারের চিরুনি তল্লাশি চলিতেছে। ছত্তিশগড়ের বাস্তার আইজি পি সুন্দররাজও এই ঘটনা নিশ্চিত করিয়াছেন। জানা গিয়াছে, নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল হইতে বিপুল পরিমাণে এ কে-৪৭ (AK-47) রাইফেল এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করিয়াছে।
আন্ধ্রপ্রদেশের এডিজি (গোয়েন্দা) মহেশ চন্দ্র লাড্ডা জানাইয়াছেন যে, প্রায় দেড় মাস ধরিয়া মাওবাদীদের গতিবিধির উপর নজর রাখিবার পরেই এই অভিযানটি চালানো হয়। এনকাউন্টারের পাশাপাশি কাকিনাড়া ও কৃষ্ণ জেলায় ৩২ জন মাওবাদীকে আটক করা হইয়াছে।
মাদভি হিড়মার পরিচয়
মাদভি হিড়মা, যিনি হিড়মাল্লু এবং সন্তোষ নামেও পরিচিত ছিলেন, ছিলেন সি পি আই (মাওবাদী)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ১৯৮১ সালে ছত্তিশগড়ের দক্ষিণ সুকমার পুওয়ার্তি গ্রামে মুরিয়া উপজাতিতে তাঁহার জন্ম। ১৭ বৎসর বয়সে, ১৯৯৬ সালে, তিনি মাওবাদী আন্দোলনে যোগদান করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই কৌশলগত পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের গুণে বাস্টার এবং দক্ষিণ ছত্তিশগড়ের মাওবাদী কার্যক্রমের প্রধান মুখ হইয়া উঠেন।
হিড়মা গেরিলা যুদ্ধের একজন মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট ছিলেন এবং পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ) ব্যাটালিয়ন-১-এর নেতৃত্ব দিতেন। তাহার প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে তিনি ২৬টিরও অধিক বড় আকারের আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, যাহাতে ১৫০ জনেরও অধিক সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তি নিহত হইয়াছেন।
তাহার দ্বারা সংঘটিত কয়েকটি মারাত্মক আক্রমণ:
২০১০ দান্তেওয়াড়া আক্রমণ: ৭৬ জন সিআরপিএফ (CRPF) জওয়ান নিহত।
২০১৩ ঝিরাম উপত্যকা গণহত্যা: ২৭ জন নিহত, যাহার মধ্যে শীর্ষ কংগ্রেস নেতারাও ছিলেন।
২০২১ সুকমা–বিজাপুর আক্রমণ: ২২ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত।
তাহার মাথার দাম ছিল ১.৪৫ কোটি টাকারও অধিক এবং তিনি ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড নকশালদের অন্যতম ছিলেন।
Delhi Car Blast : দিল্লী বিস্ফোরণ কাণ্ডে কলকাতায় নদীয়ার সাবির আহমেদকে NIA-এর জেরা, বাংলাদেশি বোমা মুর্শিদাবাদে ‘সেফ হাউজ’ হয়ে পাচার
নকশাল দমনে এই সাফল্যের গুরুত্ব
হিড়মার মৃত্যু ভারতের নকশাল-বিরোধী লড়াইয়ে এক যুগান্তকারী সাফল্য বলিয়া বিবেচিত হইতেছে:
নেতৃত্বের বিনাশ: পিএলজিএ ব্যাটালিয়ন-১-এর একজন মুখ্য কৌশলবিদকে অপসারিত করায় মাওবাদীদের অপারেশনাল পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিবে।
কার্যক্রমের দুর্বলতা: তাহার অনুপস্থিতি আন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে বৃহৎ আকারের আক্রমণ চালাইবার ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করিবে।
মনস্তাত্ত্বিক আঘাত: এই ঘটনা নকশাল ক্যাডারদের মনোবল ভাঙ্গিয়া দিবে এবং তাহাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলিবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লাভ: নিরাপত্তা বাহিনী মাওবাদীদের লুকানো ঘাঁটি, নেটওয়ার্ক এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লাভ করিতে পারে, যাহাতে অবশিষ্ট মাওবাদী পরিকাঠামো ভাঙ্গিয়া দেওয়ার প্রচেষ্টা দ্রুত হইবে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এই অপারেশনকে মাওবাদী বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি “নির্ণায়ক সাফল্য” বলিয়া অভিহিত করিয়াছে, যাহা এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



















