ব্যুরো নিউজ, ১৮ই নভেম্বর ২০২৫ : দিল্লী বিস্ফোরণের পর গোটা দেশ যখন সন্ত্রাসবাদী হামলার আশঙ্কায় ভুগছে, তখন শ্রীরামপুরের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি রাজভবনের ভিতরে বিস্ফোরক ও অস্ত্রশস্ত্র মজুত থাকার বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন। এই খবরের পরই গতকাল সোমবার রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস স্বয়ং রাজভবনে নজিরবিহীন কম্বিং বা তল্লাশি অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
কল্যাণ ব্যানার্জি গত শনিবার অভিযোগ করেছিলেন যে রাজ্যপাল বোস রাজভবনের ভেতরে “বিজেপি-র অপরাধীদের আশ্রয়” দিচ্ছেন এবং “তাদের বোমা ও বন্দুক দিয়ে সশস্ত্র করছেন”। রাজ্যপালের বিরুদ্ধে “অযোগ্য” এবং “বিজেপি-র সেবক” হওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি।
রাজ্যপালের তল্লাশি: তৃণমূল সাংসদের এই গুরুতর অভিযোগের পর রাজ্যপাল বোস উত্তরবঙ্গ সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি কলকাতায় ফেরেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তল্লাশি অভিযানের তদারকি করেন। কলকাতা পুলিশ, রাজভবন পুলিশ পোস্ট, সিআরপিএফ, বোম্ব স্কোয়াড এবং ডগ স্কোয়াড এই যৌথ অভিযানে অংশ নেয়। পুরো অভিযানটি লাইভ-স্ট্রিম করা হয় এবং সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের তা দেখার অনুমতি দেওয়া হয়।
রাজ্যপালের বক্তব্য: তল্লাশি অভিযান শেষে রাজ্যপাল বোস সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানান, রাজভবনে কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তৃণমূল সাংসদকে হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে, না হলে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“স্নিফার ডগ এবং বোম্ব স্কোয়াড ছিল। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযান ছিল এটি। কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিন্তু বাংলার মানুষের সামনে সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি রাজভবনের সম্পূর্ণ কম্বিং অপারেশন চাই,” বলেন রাজ্যপাল।
“কড়া আইনি পদক্ষেপ”: ক্ষমা না চাইলে সাংসদের বিরুদ্ধে মামলা
রাজ্যপাল বোস আরও জানান, কল্যাণ ব্যানার্জিকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো আল্টিমেটাম নয়, বরং একটি বিকল্প।
“আমি এটা স্পষ্ট করে দিয়েছি, এবং এটা কোনো চরম সতর্কতা (ultimatum) নয়। তিনি (কল্যাণ ব্যানার্জি) যদি দেখেন যে তাঁর অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাহলে বাংলার মানুষের কাছে তাঁর ক্ষমা চাওয়ার বিকল্প আছে। সেই পছন্দের জন্য আমি ২৪ ঘণ্টা সময় দিলাম। যদি তিনি বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা না চান, তাহলে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন রাজ্যপাল।
অন্যদিকে, রাজ্যপালের অফিস ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশকে কল্যাণ ব্যানার্জির বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। সূত্র মারফত জানা গেছে, নির্দেশ পালিত না হলে রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে ব্যবস্থা নিতে পারেন বলেও পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে, রাজ্যপাল লোকসভা সচিবালয়েও কল্যাণ ব্যানার্জির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাতে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন।
তৃণমূল সাংসদের পালটা আক্রমণ
রাজ্যপালের কড়া সতর্কবার্তাতেও কল্যাণ ব্যানার্জি পিছু হটতে রাজি নন। এর আগে, রাজ্যপাল যখন ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন, তখনই সাংসদ এই অভিযোগটি আনেন।
সাংসদের জবাব: রাজ্যপাল আইনি পদক্ষেপের কথা বললে কল্যাণ ব্যানার্জি পালটা বলেন, তিনি আদালতের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়বেন। তিনি আরও বলেন যে, রাজ্যপাল তাঁকে ভয় দেখাতে পারবেন না।
‘শিশুসুলভ’ মন্তব্য: রাজভবনে কম্বিং অপারেশনের পর সাংসদ আরও মন্তব্য করেন যে, “কারও অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ও বোম্ব স্কোয়াড ডেকে বিস্ফোরক আর পিস্তল খোঁজা হয় নাকি?” তিনি রাজ্যপালের এই পদক্ষেপকে ‘শিশুসুলভ’ বলেও কটাক্ষ করেন।
Delhi Car Blast : ভিডিওতে ‘শহীদ অভিযান’ তত্ত্ব, পুলওয়ামার ডাক্তার উমার উন নবীর সন্ত্রাসবাদ প্রমাণিত
সাংবিধানিক পদের মর্যাদা ও রাজ্যের নিরাপত্তা
এর আগেও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে এবং নব-নির্বাচিত বিধায়ক সায়ন্তিকা ব্যানার্জিকে রাজভবনে গিয়ে শপথ নিতে বারণ করা হয়েছিল। ভিত্তিহীন এমন একাধিক অভিযোগের পরেও রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসকে একজন দক্ষ প্রশাসকের মতো ধৈর্য ধরতে দেখা গেছে।
তবে, একটি সাংবিধানিক সর্বোচ্চ পদকে যদি বারংবার এভাবে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, তাহলে রাজ্যের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং ধৈর্যের অবস্থা কী হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওয়াকিবহাল মহল আশা করছে, রাজ্যপাল কেবল নিজের পরিস্থিতি নয়, রাজ্যের সাধারণ মানুষের কথাও ভাববেন এবং এই রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে উচিত সময়ে উচিত ব্যবস্থা নেবেন।



















