ব্যুরো নিউজ, ১৭ই নভেম্বর ২০২৫ : বিহার বিধানসভা নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD)-এর শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের প্রধান লালু প্রসাদ যাদবের পরিবারে গভীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে। এই পরিস্থিতিতে লালুর কন্যা রোহিনী আচার্য রাজনীতি ত্যাগ করিয়া পরিবারকে অস্বীকার করিলেন এবং শনিবার গভীর রাতে সিঙ্গাপুরে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দলের বিপর্যয়ের কারণ লইয়া প্রশ্ন তোলায় তাঁহাকে অপমান ও লাঞ্ছনা করা হইয়াছে— এইরূপ অভিযোগ করিয়া তিনি দেশত্যাগ করিলেন।
পাটনা ছাড়িবার পূর্বে তিনি আরজেডি-র কার্যত প্রধান তেজস্বী যাদব এবং তাঁহার বিশ্বস্ত সহকারী সঞ্জয় যাদব ও রামীজ নেমত খান-এর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করিলেন। রোহিনী বলিলেন, “সম্পূর্ণ দল জিজ্ঞাসা করিতেছে, কেন আমরা পরাজিত হইলাম। কিন্তু সঞ্জয় ও রামীজের ন্যায় ব্যক্তিরা সেই প্রশ্ন এড়াইয়া যাইতেছেন। যদি সে (সঞ্জয় যাদব) চাণক্য হইতে চায়, তবে চাণক্যকেই প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হইবে।”
রোহিণীর গুরুতর অভিযোগ: ‘নোংরা কিডনি’ অপবাদ
পাটনা বিমানবন্দরে গণমাধ্যমকে দেওয়া বিবৃতিতে রোহিনী জানান, “আমার আর কোনও পরিবার নাই। সঞ্জয় যাদব, রামীজ এবং তেজস্বীকে জিজ্ঞাসা করুন… পরাজয়ের দায়িত্ব তাঁহারা লইতে চাহেন না বলিয়া আমাকে পরিবার হইতে বহিষ্কার করিয়াছেন। সঞ্জয় ও রামীজের নাম লইলে আমাকে ঘর হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হয়, অপমান করা হয় ও চটি দ্বারা প্রহার করা হয়…”
পরে সামাজিক মাধ্যমে তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ করিলেন যে, অপমান-লাঞ্ছনার সহিত তাঁহাকে ‘নোংরা’ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে যে তিনি নাকি নির্বাচন টিকিট পাইবার বিনিময়ে পিতাকে ‘নোংরা কিডনি’ দান করিয়াছিলেন। তিনি সকরুণভাবে বিবাহিতা কন্যা ও ভগিনীদের সতর্ক করিয়া বলিলেন, “যদি তোমাদের পিত্রালয়ে পুত্র অথবা ভাই থাকে, তবে ভুলক্রমেও কখনও তোমাদের পিতাকে, তোমাদের ঈশ্বর-স্বরূপ পিতামাতাকে বাঁচাইও না।”
Bihar : বিহার নির্বাচনে ঐতিহাসিক রায়! উন্নয়নের পক্ষে ভোট, মোদীর প্রতিশ্রুতিতে মহিলা ও যুবশক্তির জয়
তেজ প্রতাপের পক্ষ সমর্থন ও পরিবারের বিভাজন
রোহিনীর প্রস্থানের পর তাঁহার ভগিনী রাজলক্ষ্মী, রাগিণী ও চন্দাও নিজ নিজ সন্তান লইয়া দিল্লি চলিয়া গেলেন, যাহা লালু-পরিবারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রমাণ।
অন্যদিকে, লালুর জ্যেষ্ঠ পুত্র তেজ প্রতাপ যাদব, যিনি পূর্বে দল ও পরিবার হইতে কোণঠাসা ছিলেন, তিনি প্রকাশ্যে রোহিনী আচার্যকে সমর্থন জানাইলেন। তিনি বলিলেন, “যাহারা আমাদের ভগিনীকে অপমান করিবে, তাহারা কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রের সম্মুখীন হইবে।” তিনি তেজস্বী যাদবকে লক্ষ্য করিয়া ‘বিশ্বাসঘাতক’দের সতর্ক করিলেন এবং পিতাকে উদ্দেশ্য করিয়া আবেগপূর্ণ আবেদন জানাইলেন, “একবার শুধু সঙ্কেত দিন, বিহারের জনগণই এই বিশ্বাসঘাতকদের কবর দিবে।”
তেজস্বী যাদব তাঁহার সহকারী সঞ্জয় যাদবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আসন বণ্টনে বৈষম্য লইয়া রোহিনীর উত্থাপিত কোনও প্রশ্নেই প্রকাশ্যে মুখ খুলেন নাই।
Bihar : বিহার নির্বাচন এক্সিট পোল: বিহারে এনডিএ-র বড় জয়ের আভাস, মহাজোটের প্রত্যাখ্যানে বিতর্ক।
রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
আরজেডি-র এই পারিবারিক অশান্তি লইয়া রাজ্যের রাজনৈতিক মহল দ্বিধা বিভক্ত।
নীতিশ কুমারের জোট: এলজেপি (রাম বিলাস) প্রধান চিরাগ পাসোয়ান এই বিষয়ে মন্তব্য করিতে অস্বীকার করিয়াছেন, কিন্তু দ্রুত পারিবারিক বিরোধ মিটিবার জন্য প্রার্থনা জানাইলেন। জেডি(ইউ) মুখপাত্র নীরজ কুমার উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া রোহিনীকে “যিনি পিতার জীবন বাঁচাইয়াছেন, সেই গৃহের লক্ষ্মী” বলিয়া অভিহিত করিলেন এবং তাঁহার প্রতি অপমানকে ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলিলেন।
বিজেপি ও অন্যান্য দল: বিহার বিজেপির সভাপতি দিলীপ জয়সওয়াল লালু ও রাবড়ি দেবীকে পরিবারকে ভাঙনের হাত হইতে রক্ষা করিবার অনুরোধ জানাইলেন। বিজেপি নেতা বুরা নরসাইয়া গৌড় বংশতান্ত্রিক রাজনীতির সমালোচনা করিয়া বলিলেন যে ক্ষমতা-ভাগ এবং দুর্নীতি-লব্ধ বিপুল সম্পত্তির সংঘাত হইতেই এই পারিবারিক ফাটল সৃষ্টি হইয়াছে।
মুকেশ সাহানী (ভিআইপি): ভিআইপি প্রধান মুকেশ সাহানী রোহিনীর পক্ষ লইয়া বলিলেন যে পরাজয়ের দায়ভার সকলের, কোনও একজন ব্যক্তির উপর দোষ চাপানো অনুচিত। তবে তিনি এনডিএ-র বিপুল বিজয়কে অর্থের দ্বারা চালিত ম্যান্ডেট বলিয়া মন্তব্য করিয়া অভিযোগ করেন যে ভোটের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা স্থানান্তরের কারণেই এনডিএ জয়লাভ করিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করিতেছেন, এই পারিবারিক আলোড়ন লালু পরিবারের “বংশতান্ত্রিক রাজনীতির” দুর্বলতা প্রতিফলিত করিতেছে। লালু প্রসাদ যাদবের নীরবতা এই বৃহত্তর প্রশ্নটি উত্থাপন করিতেছে: ইহা কি শুধু একটি পরিবারের ভাঙন, নাকি আরজেডি দলেরও বিলুপ্তি ?



















