maa sita birth significance

ব্যুরো নিউজ ০৭ নভেম্বর ২০২৫ : রামায়ণের একটি অলৌকিক অধ্যায় যখন রাজা জনক যজ্ঞের জন্য লাঙ্গল দিয়ে ভূমি কর্ষণ করিতেছিলেন, ঠিক সেই ক্ষণে তিনি লাঙ্গলের ফলার স্পর্শে এক জ্যোতির্ময়ী কন্যাকে মৃত্তিকার গভীর হইতে লাভ করেন। গর্ভজাত না হইয়াও তিনি ধরিত্রী মাতা হইতে জন্মিলেন, তাই তাঁহার নাম হইল ‘সীতা’, অর্থাৎ লাঙ্গলের ফলার রেখা। সেই মুহূর্ত হইতে তিনি কেবল জনকের কন্যা নহেন, তিনি হইলেন স্বয়ং ধরিত্রী মাতার দুহিতা। প্রথম দর্শনে ইহা এক চমৎকারী পৌরাণিক গল্প বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু এই আখ্যানের অন্তরে নিহিত রহিয়াছে জীবনের, প্রকৃতির এবং দিব্য নারীশক্তির এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন।

 

বেদে ও পুরাণে সীতার স্বরূপ

সীতা এমন এক চরিত্র নহেন, যাঁহার সূচনা কেবল রামায়ণে। তাঁহার মূল প্রোথিত আছে সুপ্রাচীন বেদের গভীরে।

  • ঋগ্বেদে দেবীরূপ: ঋগ্বেদে সীতাকে উর্বরতার দেবী হিসাবে আবাহন করা হইয়াছে। তিনি শস্য, ফসলের প্রাচুর্য এবং কল্যাণের প্রতীক। কৃষকগণ ভূমির আশীর্বাদ ও ভালো ফলনের জন্য তাঁহার স্তুতি করিতেন।
  • পুরাণে লক্ষ্মী-স্বরূপ: পুরাণগুলিতে সীতাকে বিষ্ণুর নিত্য সহধর্মিণী লক্ষ্মী রূপে অভিহিত করা হইয়াছে, যিনি যুগে যুগে শ্রীভগবানের অবতারে তাঁহার সহিত ধরাতলে অবতীর্ণ হন। রাম যখন বিষ্ণু, তখন সীতা অবশ্যই লক্ষ্মী। তিনি হইলেন আদি শক্তি—প্রকৃতির জীবন্ত চালিকাশক্তি, যিনি লালন করেন এবং ধারণ করিয়া থাকেন। মাটির গভীরে জন্ম নিয়া তিনি নিজেই ভূমি দেবী রূপে প্রকাশিত, যিনি বিশ্বজননীর চেতনা।

সনাতন ধর্মের মহাজাগতিক সংহতি : বিষ্ণুর অবতার ও নবগ্রহ

মাটি হইতে জন্মগ্রহণের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

তিনি কেন গর্ভ হইতে জন্মিলেন না? সনাতন হিন্দু দর্শন এই প্রশ্নে জ্ঞানের একাধিক স্তর উদ্ঘাটন করে:

  • নিষ্পাপ পবিত্রতা: মৃত্তিকা হইতে জন্ম গ্রহণের অর্থ হইল তিনি মানবীয় জন্মগত সীমাবদ্ধতা ও বন্ধন হইতে মুক্ত। তিনি কাহারও বংশ বা গোত্রের অধীন নহেন, তিনি সকলের। তাঁহার দেবত্ব ও পবিত্রতা প্রশ্নাতীত।
  • প্রকৃতির সহিত একাত্মতা: সীতা মানবজীবন ও ধরিত্রী মাতার একতার প্রতীক। ধরণী যেমন কোনো প্রতিদান ব্যতিরেকে আমাদের খাদ্য, জল ও আশ্রয় দেন, সীতাও তেমনই নিঃস্বার্থ প্রেম, বলিদান এবং সহনশীলতা দিয়াছেন।
  • নারীশক্তির চিরন্তন রূপ: হিন্দু ধর্মে নারীশক্তিকে দ্বিতীয় বা গৌণ ভাবা হয় না, বরং তাঁহাকে সৃষ্টির মূল উৎস বলিয়া মান্য করা হয়। সীতার ভূমি হইতে উদ্ভব এই সত্যকে ঘোষণা করে যে, নারীত্ব প্রকৃতির মতোই চিরন্তন ও বিশাল, কেবল জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আবদ্ধ নহে।
  • উৎস-এ প্রত্যাবর্তন: যখন জগৎ তাঁহার প্রতি অবিচার করিল এবং বারংবার পবিত্রতার প্রমাণ চাহিল, তখন সীতা নিজ ইচ্ছায় সেই ভূমিতেই ফিরিয়া গেলেন, যেখান হইতে তিনি আবির্ভূতা হইয়াছিলেন। তিনি প্রমাণ করিলেন, আমাদের চূড়ান্ত আশ্রয় এবং শাশ্বত শরণ কেবল সেই আদি উৎসের মধ্যেই নিহিত।

 

Brahma ; সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সীমিত উপাসনা: এক বিস্ময়কর রহস্য !

যে শিক্ষা আজও আমাদের জীবনের প্রতিবিম্ব

সীতার ভূমি হইতে জন্ম কেবল একটি গল্প নহ, ইহা দর্শনের এক অনন্য রূপ। এই আখ্যান আজও আমাদের জীবনে অমূল্য শিক্ষা বহন করে:

  • সহনশীলতা শান্ত কিন্তু অটল: ধরণী মাতার মতো সীতাও চাপ, ঝড় এবং অবিচার নীরবে সহ্য করিয়াছেন, তথাপি তিনি স্থির ও অবিচল রহিয়াছেন।
  • পবিত্রতা প্রমাণসাপেক্ষ নহ, ইহা জীবনযাপন: তাঁহার চরিত্র কেবল অপরের স্বীকৃতিতে উজ্জ্বল হয় নাই, তিনি সততা ও সত্যের পথে জীবনযাপন করিয়াছেন বলিয়া তাঁহার জ্যোতি ছড়াইয়া পড়িয়াছে।
  • ধরিত্রী পবিত্র: এই সত্য ভুলিলে সীতাকেই ভোলা হয়। ভূমি, নদী, অরণ্যকে সম্মান করাই তাঁহার প্রতি প্রকৃত সম্মান।
  • প্রকৃত ন্যায় স্ব-নির্বাচিত: সীতার অন্তিম কার্য, নিজ শর্তে ভূমিতে ফিরিয়া যাওয়া—ইহা দুর্বলতা নহ, বরং তাঁহার শক্তির শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। তিনি দেখাইলেন যে মর্যাদা বা আত্মসম্মান দানসাপেক্ষ নহ, ইহা সর্বদা আমাদের অন্তরেই থাকে।

সীতার গল্প কেবল এক অতীত ইতিহাস নহ। ইহা আমাদের জন্য এক জীবন্ত দর্পণ। যখনই আমরা পৃথিবীর দিকে দৃষ্টিপাত করি, আমরা তাঁহাকেই দেখি। যখনই আমরা ত্যাগ, স্থিতিস্থাপকতা এবং মর্যাদার কথা বলি, আমরা তাঁহারই স্মরণ করি।

তিনি ভূমি হইতে আসিয়াছিলেন আমাদের এই কথা স্মরণ করাইয়া দিতে যে, দেবত্ব দূরে নহ, তাহা আমাদের পায়ের নীচে, আমাদের চারপাশে এবং আমাদের অন্তরেই বিরাজমান।

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর

বিশ্ব জুড়ে

গুরুত্বপূর্ণ খবর